নিজস্ব প্রতিবেদক // সোনালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল অফিস, বরিশালের ডিজিএম জাহাঙ্গীর সরদারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্টের ক্ষমতার অপব্যবহার, সাবেক জিএম ডিজিএমদের চাপে রেখে বদলি বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তিনি বরিশাল অঞ্চলের ব্যাংকিং কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছেন যারা তার দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছেন ।
চাকরির সুবাদে গোপালগঞ্জ থেকে বরিশালে এসে জাহাঙ্গীর সরদার নিজেকে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং বরিশালের সাবেক চীফ হুইফ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর মেয়ে জামাই হিসেবে পরিচিত করে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি এই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন শাখায় বদলি বাণিজ্যে করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, বরিশালে এসে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর বাসায় যাতায়াতের সূত্রে কান্তা আবদুল্লাহর বান্ধবী লায়লা পারভিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে তাদের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়।এরপর তিনি রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্ককে পুঁজি করে ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে এবং সকল সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলের বিভিন্ন শাখায় কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের বদলি ও পদায়নে তিনি দীর্ঘদিন প্রভাব খাটিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সুবিধাজনক পদায়নের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। একই সঙ্গে দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও রয়েছে।
সর্বশেষ প্রিন্সিপাল অফিস ইস্ট এর দায়িত্বে থাকাকালে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নাচনমহল হাট শাখার ম্যানেজার মো: মামুন হোসেন, হিজলা শাখার ম্যানেজার নিতাই চন্দ্র, নেয়ামতি বন্দর শাখার ম্যানেজার আসাদ এবং কামারখালি শাখার ম্যানেজার বিপুল চন্দ্র পালকে ম্যানেজার হিসেবে পদায়ন করেছেন । দক্ষ অফিসারদেরকে ডিজিএম জাহাঙ্গীর আলম সব সময় হয়রানি করেন তাকে যারা অনৈতিক সুবিধার ব্যবস্থা করে দেন তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন বলে জানা যায় ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহকে প্রধান অতিথি হিসেবে এনে তিনি নিজের প্রভাব প্রদর্শন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেক কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেতেন না বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
এছাড়াও ব্যাংকার্স ক্লাব বরিশালের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ব্যাংকের সকল শাখা থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং সেই অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। ক্লাবের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বরিশাল অফিস অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শীতার্তদের কম্বল বিতরন করার নাম করে হাজার হাজার কম্বল সংগ্রহ করে নগরীর মহসীন মার্কেটে বিক্রি করে দেন জাহাঙ্গীর সরদার । ব্যাংকার্স ক্লাবের নামে খেলাধুলা আয়োজন করে বরিশালের সকল ব্যাংকের শাখা হতে লক্ষ লক্ষ টাকা চাদাঁ সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে । এই চাদাঁ সংগ্রহ করেন তার আর্থিক অনিয়মের পিএস, অনুমোদনহীন জিয়া পরিষদের সাধারন সম্পাদক এসএম মোস্তাফিজুর রহমান ও তার সিন্ডিকেট । খেলাধুলায় সংগ্রহীত টাকা ব্যয় না করায় বিভিন্ন ব্যাংকের ম্যানেজারগণ তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেন মর্মে জানা যায়
এ কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে সোনালী ব্যাংকের আমানত অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয় বলে জানা যায়।
এছাডা অফিস সময়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে অফিসের বাইরে থাকেন এবং রাতে অফিস করার কারনে কর্মপরিবেশে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলে সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি সোনালী ব্যাংক ভবনের মসজিদের জন্য বিভিন্ন শাখা থেকে সংগ্রহ করা ফ্যান মসজিদে স্থাপন না করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর সরদার ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এস এম মোস্তাফিজুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে স্ত্রীকে অফিসে এবং মেয়েকে কলেজে আনা নেয়া করেন। শাখা এবং অফিসের জন্য কম্পিউটার, প্রিন্টার, মনিটর, ইউপিএসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম এবং নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে কমিশন বানিজ্য করেছেন যার কারনে নিন্ম মানের সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে। এসব বিষয়ে একাধিকবার তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত কার্যকর ফলাফলে পৌঁছেনি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
জাহাঙ্গীর সরদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দুর্নীতির পিএস খ্যাত এস এম মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে না থেকেও বরিশাল বিভাগের যে কোন বদলি, কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, ওরিয়েন্টেশন কোর্স এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনে প্রভাব বিস্তার করেন। নিম্নমানের খাবার সরবরাহ, মানহীন ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা, সল্পমূল্যের উপহার ক্রয়ের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ ১৫ বছরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে জাহাঙ্গীর সরদার বরিশালের অভিজাত কলেজ রো এলাকায় স্ত্রীর নামে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। এছাড়া ঢাকায় তার দুই কন্যার নামে দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করা হয়েছে বলেও জানা যায়।
গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জাহাঙ্গীর আলম সরদারকে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুনরায় বরিশালে জেনারেল ম্যানেজারস অফিসে স্ট্যান্ড রিলিজেের আদেশ দেওয়া হলে প্রিন্সিপাল অফিস ইস্ট এর কর্মকর্তাদের মধ্যে ঈদের আনন্দ বিরাজ করলেও বরিশাল বিভাগের ৭৮টি শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন একজন নির্বাহী যদি প্রতিটি পদে পদে দুর্নীতি করেন তার অদেশ মানতে ব্যাপক কষ্ট হয়। তারা একজন সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তার নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান জিএম ইনচার্জ মাহমুদুল হক সেলিমও জাহাঙ্গীর সরদারের প্রভাবের কারণে স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না বলে জানা যায়। জনাব জাহাঙ্গীর সরদার তার বন্ধু সোনালী ব্যাংকের ডিরেক্টর আবু ইউসুফের নাম ভাঙ্গীয়ে জিএম ইনচার্জসহ সবাইকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি প্রদান এবং চাপ সৃষ্টি করেন। এছাড়া তিনি শীঘ্রই জিএম হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে বরিশালের জিএম এর চেয়ারে বসে সবাইকে দেখে নিবেন মর্মে কঠোর হুশিয়ারী দিচ্ছেন । জাহাঙ্গীর সরদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও আজ পর্যন্ত কোনো অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। সাবেক জিএম গোপাল চন্দ্র গোলদারকে ৫ আগস্ট তার চেম্বারে আটকিয়ে মব সন্ত্রাস করে ব্যাপক অনৈতিক সুবিধা নেন মর্মে অভিযোগ রয়েছে ।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডিজিএম জাহাঙ্গীর সরদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।
অন্যদিকে,নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোনালী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল অঞ্চলের ব্যাংকিং কার্যক্রমে একটি অঘোষিত প্রভাববলয় সক্রিয় ছিল। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কর্মকর্তা বদলি, পদায়ন এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে ওই বলয়ের প্রভাব লক্ষ্য করা যেত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, প্রিন্সিপাল অফিস ইস্ট এর বিভিন্ন শাখায় কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভয়ের সংস্কৃতি কাজ করেছে। কেউ তার দুর্নীতির বিষয়ে আপত্তি তুললে তাকে অন্যত্র বদলি করা হতে পারে কিংবা ব্যবস্থাপক পদ থেকে প্রত্যাহার করা করা হতে পারে এমন আশঙ্কা অনেকের মধ্যেই ছিল।”
ব্যাংকের একজন সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসত অযথা বিতর্কও দূর হতো, কর্মপরিবেশ ঠিক থাকতো এবং বরিশালে সোনালী ব্যাংকের ভাবমূর্তি এত ক্ষুণ্ণ হতোনা।